প্রদীপের অ’পকর্ম জেনে যাওয়ায় জীবন দিতে হয়েছে সিনহাকে?

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পু’লিশ হাসপাতাল থেকে আত্মসম’র্পণের জন্য কক্সবাজার আ’দালতে আসেন টেকনাফের আ’লোচিত সেই ওসি প্রদীপ কুমা’র দাশ।

হ’ত্যা মা’মলা থাকার পরও কেন প্রদীপ কুমা’রকে গ্রে’ফতার করা হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে এর আগে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রদীপ নিজ থেকেই আ’দালতের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

তিনি যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য পু’লিশ পাহারা রয়েছে। গত মঙ্গলবার ওসি প্রদীপ অ’সুস্থ দাবি করে ছুটি নিয়ে থা’না থেকে বেরিয়ে যান। পরে তিনি চট্টগ্রাম পু’লিশ হাসপাতা’লে ভর্তি হন। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। আ’দালতের আদেশের পর আ’সামিদেরকে কক্সবাজার জে’লা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

প্রদীপ ভুলেই গিয়েছিলেন মানুষেরও প্রা’ণ আছে!

পাখির মতো মানুষ খু’ন করতে করতে ওসি প্রদীপ ভুলেই গিয়েছিলেন মানুষেরও প্রা’ণ আছে! ক্রসফায়ারের নামে একের পর এক মানুষ খু’নের মাধ্যমে দেশের সীমান্ত উপজে’লা টেকনাফকে মৃ’ত্যুপুরী বানানো ভ’য়ঙ্কর সেই ওসি প্রদীপ কুমা’র দাশের বি’রুদ্ধে এখন নির্যাতিত মানুষেরা কথা বলতে শুরু করেছেন।

এক এক করে বেরিয়ে আসছে তার চাঁদাবাজি, ইয়াবাবাজিসহ নানা লোমহর্ষক কর্মকা’ণ্ড। সহযোগী দীপক, সজিব ও মিঠুনদের নিয়ে প্রদীপ কুমা’র দাশের গড়ে তোলা মাফিয়া চক্রের বি’রুদ্ধে কথা বলা এক সময় সবচেয়ে ঝুঁ’কিপূর্ণ কাজ ছিল কিন্তু সে’নাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মক’র্তার জীবনের বিনিময়ে কিছুটা হলেও ফিরেছে মানুষের সাহস।

সবশেষে বিচার হবে কি না এ নিয়ে সাধারণের মধ্যে অনেক প্রশ্ন থাকলেও আপাতত প্রদীপ যে বিচারের কাঠগড়ায় তাও বা কম কি? এমনটাই ভাবছেন স্বজনহারাদের পরিবারগুলো।

ওসি প্রদীপের এমন নিষ্ঠুরতার অন্ধ সম’র্থনকারী হিসেবে এখন জে’লা পু’লিশ সুপারের বি’রুদ্ধেও কথা বলছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। সাবেক রাষ্ট্রদূত ম’রহু’ম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর কন্যা এবং সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের বোন নাজনীন সরওয়ার কাবেরী তার টাইম লাইনে লিখেছেন, ‘সাবাস হিরো শহীদ সিনহা মোহাম্ম’দ রাশেদ। তোমা’র মৃ’ত্যুর মধ্য দিয়ে হলেও আম’রা সকল নিরপরাধ মানুষ হ’ত্যার বিচার পাবো। ‘তামিল সিনেমা’র নায়কের গ্রে’ফতারের সাথে সাথে আম’রা, সিনেমা’র প্রযোজককেও (এসপি) অ’পসারণ ও রি’মান্ডের দাবি জানাই।’

তিনি আরো লিখেছেন ‘দীর্ঘ দিন ধরে জে’লা পু’লিশ, মিথ্যা মা’মলা হা’মলায় উখিয়া টেকনাফসহ সারা জে’লায় নিরপরাধ মানুষের বি’রুদ্ধে কাজ করেছে। যার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে সিনহা মোহাম্ম’দ রাশেদ খু’ন হওয়া।’ ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে নিরপরাধ ব্যক্তিকেও ক্রসফায়ার করা হয়েছে, হাতিয়ে নেয়া হয়েছে টাকা কড়ি, শেষসম্বল।

রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে উখিয়া টেকনাফ আজ নেতৃত্বশূন্য। ইয়াবার টাকায় দাপটে চলছে ডনরা। তারা ওসি প্রদীপের অ্যাকাউন্ট মজবুত করে বাহুলগ্নতা পেয়েছে। পু’লিশ সুপার সব কিছু জেনেও অচেতন ছিলেন। পু’লিশি বর্বরতার এই দায় কি সুপার মাসুদ এড়াতে পারেন? নিরপরাধ মানুষকে ইয়াবায় ফাঁ’সানোর বিভিন্ন প্রয়াসের প্রতিবাদ করলে বলা হতো ইয়াবা ব্যবসায়ীকে উসকানি ও সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। উখিয়ায় সাধারণ মানুষের পকে’টে ইয়াবা দিয়ে টাকা ছিনতাই অ’তঃপর মা’রধর ও জে’লে অন্তরীণ করার বি’রুদ্ধে কথা বলায় ও আইজিপির কাছে লিখিত বিচার প্রার্থনা করায় এসপির ক্ষোভের অন্ত নেই? কেন সিনহার মতো মেধাবী মানুষ যিনি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছেন, তাকে হ’ত্যার পরও ইয়াবা, গাঁজা, বিদেশী ম’দ ও অ’স্ত্র পাওয়া গেছে বলে সাফাই গাইলেন এসপি সাহেব! এর মাধ্যমে তিনি কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি! এতেই কি প্রমাণ হচ্ছে না, এসপি নিজেই প্রদীপের আশ্রয়দাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন!

ওসি প্রদীপে নির্দেশেই মেজর রাশেদ সিনহাকে ক্রসফায়ার

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা প্রায় এক মাস ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করায় সংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে অ’পরিচিত ছিলেন না। অনেকবার তিনি শাপলাপুর চেকপোস্ট অ’তিক্রম করেছেন পু’লিশের বিনা বাধায়। সূত্র মতে, তিনি কক্সবাজারের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভিডিও চিত্র সংগ্রহের পাশাপাশি তার চোখে ধ’রাপড়া টেকনাফ পু’লিশের মা’দক কারবার স’ম্পর্কেও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তার এই ভূমিকায় দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন ওসি প্রদীপসহ তার পালা দুর্বৃত্ত চক্র। তাই সিনহাকে শেষ করার পরিকল্পনা আগে থেকেই নিয়েছিলেন ওসি প্রদীপ। শুধু অ’পেক্ষা করছিলেন সুযোগের।

সেই মতে ঈদের সময়ে অর্থাৎ ৩১ জুলাই রাতের অন্ধকারে সিনহাকে পেয়ে পরিক’ল্পিতভাবে ক্রসফায়ারের নির্দেশ দেন প্রদীপ। শুধু তাই নয়, গু’লি করার পর ওসি প্রদীপ দ্রুত থা’না থেকে এসে গু’লিবিদ্ধ সিনহার দেহ থেকে প্রা’ণ বের হচ্ছিল এমন অবস্থায় লাথি মে’রে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর সিনহার সেই ভিডিও, সেই তথ্য ধ্বংস করে দেন। ওসি প্রদীপ সর্বশেষ এক ভিডিও বার্তায় ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টেকনাফকে মা’দকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘গায়েবি হা’মলা হবে বাড়ি ঘরে, গায়েবি অ’গ্নিসংযোগ হবে।’

প্রদীপের এই ঘোষণার পর ঈদের দিন বেশ কিছু বাড়ি ঘরে হা’মলা চালানো হয় এবং খুরেরমুখ এলাকায় সড়কের পাশে উঠিয়ে রাখা বেশ কিছু জে’লে নৌকায় (ফিশিংবোট) অ’গ্নিসংযোগ করা হয় এবং শতাধিক বাড়ি ঘরে অ’গ্নিসংযোগ হা’মলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এ সময় চলে ব্যাপক চাঁদা আদায়। এখানে সেখানে পাওয়া যায় গু’লিবিদ্ধ লা’শ।

সর্বশেষ গত ২৮ দিনে ১১টি ব’ন্দুকযু’দ্ধে উখিয়ার জনপ্রিয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বখতেয়ারসহ কথিত ব’ন্দুকযু’দ্ধে হ’ত্যা করা হয় ২২ জনকে। ২৯ জুলাই হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আমতলী এলাকার আনোয়ার হোসেন (২৩), পূর্ব মহেষখালীয়া পাড়ার আনোয়ার হোসেন (২২), নয়াবাজার এলাকার ইসমাইল (২৪) ও খারাংখালী এলাকার নাছিরকে ধরে নিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে রাতে মেরিন ড্রাইভ সড়কে নিয়ে ‘ব’ন্দুকযু’দ্ধ’ সম্পন্ন করে। ওই দিন কক্সবাজার ঝাউবাগান থেকে পাওয়া যায় গু’লিবিদ্ধ অ’পর এক যুবকের লা’শ। ওসি প্রদীপ আগে এবং পরে মা’দক নির্মূলের ঘোষণা দিয়ে যতগুলো কথিত ব’ন্দুকযু’দ্ধের কথা বলেছেন সব ক’টিতে ইয়াবা তথা মা’দক, অ’স্ত্র ও হ’ত্যা তিনটি মা’মলা এন্ট্রি করত। এসব মা’মলায় এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আ’সামি করা হয়। তারপর শুরু হয় গ্রে’ফতার বাণিজ্য।

মা’মলার চার্জশিট থেকে আ’সামি বাদ দেয়া এবং চার্জশিটে নাম দেয়ার ভ’য় দেখিয়ে আদায় করা হয় কোটি কোটি টাকা। মাসে শত কোটি টাকা উপার্জন করে ওসি প্রদীপ। তথ্য মতে, প্রদীপের বি’রুদ্ধে পু’লিশ হেডকোয়ার্টারে অনেকবার চাঁদাবাজি, স্বামীকে আ’ট’কে স্ত্রী’কে ধ’র্ষণ, ইয়াবার নামে ব্যবসায়ীদের হয়’রানি, মিথ্যা মা’দক মা’মলায় ফাঁ’সিয়ে কোটি টাকা আদায় ইত্যাদি বহু অ’ভিযোগ গেছে; কিন্তু পু’লিশ হেডকোয়ার্টার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে তার পোষা মাফিয়াচক্রের বহুবিধ অ’পকর্ম নৃ’শংসতার তথ্য এখন পাওয়া যাচ্ছে। হোয়াইক্যংয়ে আনোয়ার নামে এক ব্যক্তিকে তিন দিন ধরে টর্চার সেলে নি’র্যাতন করে হ’ত্যা করা হয়। প্রতিকার পেতে তার স্ত্রী’ এবং বোন কক্সবাজার আ’দালতে এলে খবর পেয়ে তিনি দুই নারীকে তুলে নিয়ে টানা ৫ দিন গণধ’র্ষণ করে এবং প্রত্যেককে ইয়াবা দিয়ে চালান দিয়ে দেয়। প্রদীপ হ্নীলার দুবাই ফেরত এক যুবককে ধরে সকালে এক পা ও এক হাতে গু’লি করে বাড়িতে ফোন করে টাকার জন্য। তার স্বজনেরা ২২ লাখ টাকা নিয়ে সন্ধ্যায় থা’নায় গিয়ে দিয়ে এলেও ওই যুবককে তার ক্ষতস্থানে ছু’রি দিয়ে আ’ঘাতে হ’ত্যা করে।

সম্প্রতি হ্নীলার যুবক শাহীনকে জুমা’র নামাজরত অবস্থায় তুলে নিয়ে নি’র্মমভাবে হ’ত্যা করে। শাপলাপুরে বৃক্ষপ্রে’মিক হিসেবে চ্যানেল আই পুরস্কার পাওয়া হাবিব উল্লাহ স্থানীয় এক পু’লিশ ও এনজিও কর্মক’র্তার সাথে বিরোধের অ’প’রাধে হাবিবকে আ’ট’ক করে নি’র্মমভাবে হ’ত্যা করায় ওসি। বিজিবির সোর্স হাসান আলী মা’দক ও ওসির বি’রুদ্ধে কথা বলায় ক্ষিপ্ত হন প্রদীপ। ফলে হাসান আলীকে তার ফিশিং জাল মেরামতকালে প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে তিন দিন আ’ট’ক রেখে কথিত ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হত হয় বলে প্রচার করেন। এই ঘটনায় স্বামী হা’রানো স্ত্রী’ প্রতিবাদ করায় তার মা’থা গোঁজার শেষ ঠিকানা বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ম’রহু’ম মোস্তাক আহম’দ চৌধুরীর একমাত্র সন্তান জুনাইদকে গ্রে’ফতার করতে গিয়ে তার বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ঝিমংখালীর এক শিক্ষককে মা’দক মা’মলার ক্রসফায়ারের হু’মকি দিয়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করে এবং পরে একটি মা’দক মা’মলায় চালান দেয়।

সিআইপি সাইফুল থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা আদায় করার পরও তাকে ক্রসফায়ারে হ’ত্যা করা হয়। এভাবে শত শত মানুষকে তিনি ধরে নিয়ে নি’র্যাতন করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং ক্রসফায়ারের নামে হ’ত্যা করেছেন। নিরীহ অনেক রোহিঙ্গাকে ইয়াবা কারবারি বানিয়ে ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হতের ঘটনা সাজিয়ে উচ্চ’মহলের বাহবা কুড়াতেও কার্পণ্য করতেন না। তার হাতেই টেকনাফে ১৪৫টি ব’ন্দুকযু’দ্ধের ঘটনা ঘটে এবং ১৪৪ জনকে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হয়। তিনি ২০১৮ সালে কক্সবাজার জে’লা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহ’জাহান চৌধুরীকে কক্সবাজার ছেড়ে চলে যেতে হু’মকি দিয়ে বলেছিলেন এলাকা না ছাড়লে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে।

এত সব ব’ন্দুকযু’দ্ধের পরও প্রদীপ পু’লিশে জাতীয় বীরে পরিণত হন এবং ২০১৯ সালে পু’লিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পু’লিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পু’লিশ সদর দফতরে ছয়টি সাহসিকতাপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করেন এবং সব ক’টি ঘটনাতেই আ’সামি নি’হত হন। প্রদীপ কুমা’র দাশ প্রায় ২৫ বছরের চাকরিজীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে। তিনি কক্সবাজারের চকরিয়া, মহেশখালী এবং সর্বশেষ টেকনাফ থা’নায় ছিলেন। মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্ম’দ রাশেদ খান হ’ত্যা মা’মলার আ’সামি হওয়ার পর গত বুধবার তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

সুত্র: নয়াদিগন্ত।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*